মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন স্বেচ্ছাসেবীরা

বিপ্লব সরকার মাত্র পাঁচ টাকায় স্কুলের বাচ্চাদের টিফিনের খাবার দেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসে বস্তির বাচ্চাদের জন্য স্কুল করেছেন আবু জাফর। তাঁর স্কুলে বাচ্চাদের সঙ্গে মায়েরাও লেখাপড়া করেন, বাচ্চাদের মতোই পরীক্ষা দেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের নিশাত তাসনিম পথশিশুদের লেখাপড়া শেখান। আলেয়া হাসপাতালের অজ্ঞাতপরিচয় রোগীদের সেবা দেন। সমাজ বদলের এসব গল্প শুনতে শুনতে আনন্দে অনেকের চোখে পানি চলে আসে। সবাই একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন।

নীরবে নিভৃতে করে যাওয়া এসব ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ভলান্টিয়ার সার্ভিসেস ওভারসিজ (ভিএসও) এবং প্রথম আলো। রোববার রাজশাহী নগরের গণকপাড়ায় একটি রেস্তোরাঁয় এই সম্মাননা পর্বের অংশ হিসেবে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে ৫০টিরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও তরুণ-তরুণীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠান শুরু হয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে। পরে দেখানো হয় প্রথম আলোর পাঠশালা নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র, ভিএসওর ভিডিও এবং সংগীত। বয়সে সবাই প্রায় তরুণ।

কেউ পড়াশোনা শেষে চাকরি করেছেন, আবার কেউ পড়ছেন। এর পাশাপাশি প্রাণের টানে এই সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। এই তরুণদের উৎসাহ দিতে উপস্থিত হয়েছিলেন তারুণ্যপূর্ণ মধ্যবয়সী কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে মাহবুব সিদ্দিকী রাজশাহী অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া নদ-নদীর সন্ধান দিয়েছেন। এই বয়সীদের একজন কয়েক শ প্রজাতির ধানের বীজ সংরক্ষণ করেছেন। নতুন ধানের আবিষ্কার করেছেন আরেকজন।

সভায় প্রথম আলো বন্ধুসভা রাজশাহীর সাবেক সভাপতি ফারুক হোসেনের সঞ্চালনায় প্রথম আলোর যুব কর্মসূচি বিভাগের প্রধান মুনির হাসান বলেন, ‘যাঁরা এ দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে গেছেন। নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয় আর কিছু হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধারা এই জীবনটাই দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। যাঁরা স্বেচ্ছাসেবা করেন, তাঁরা কোনো প্রাপ্তির জন্য কাজ করেন না।

কেউ পাঁচ টাকায় খাওয়াচ্ছেন, কেউ নিজের দোকান চালিয়ে শিশুদের পড়াচ্ছেন, তাঁরা কিন্তু কোনো পুরস্কারের জন্য করছেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কেন এই কাজের স্বীকৃতি দিচ্ছি। কারণ, এই কাজের লোকগুলো কমে যাচ্ছে। আমরা সারা দেশে কয়েকজনকে পুরস্কার দিচ্ছি। কিন্তু এটা উপলক্ষ মাত্র। একটু উৎসাহিত করার জন্য এই কাজ করা। এর বাইরেও অনেকে অনেক সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, যাঁরা তরুণ প্রজন্ম আছেন, তাঁদের স্বেচ্ছাসেবার দিকে ধাবিত করা।’

ভিএসওর কান্ট্রি ফান্ড রাইজিং ম্যানেজার সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানান। তাঁরা প্রতিবছরই এ কাজ করে যেতে চান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন প্রথম আলোর রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ। উপস্থিত ছিলেন প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে যাওয়া স্বেচ্ছাসেবী কল্পনা রায় ভৌমিক, রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান, গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবক মাহবুব সিদ্দিকী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবী অনুপম হিরা মন্ডল, বিলুপ্ত ধানের সংগ্রাহক ইউসুফ আলী, বীজ সংগ্রাহক নূর মোহাম্মদ প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে অংশ নেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের নওরীন আমিনা, টুকরো হাসির সাজিয়া সুলতানা মিম, বিডিক্লিনের রাইমুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এডুকেশন ক্লাবের খুরশীদ রাজীব, স্বপ্নের বাক্স ফাউন্ডেশনের সামস শফিউল আলম, রোটার‌্যাক্ট ক্লাবের জাহিদুল ইসলাম, এসো পড়তে শিখির নিশাত তাসনিম মৌ, স্বেচ্ছায় রক্তদান সংগঠন স্বজনের আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাঁধনের বকুল হোসেন, রাজশাহী বাঁধনের রাহাত খান।

ওরা ১১ জনের জাহিদুল ইসলাম, সূর্যকিরণ বাংলাদেশের শাইখ তাসনীম, স্বপ্ন পূরণ ফাউন্ডেশনের জুখার দুদায়ের, ডেনটিস্ট ক্লাবের আমানুল্লাহ বিন আখতার, স্বপ্ন বৃত্তের শাহরিয়ার তাজ, আমরা তরুণের আনোয়ারুল হক, প্রতিবন্ধী স্কুল আনন্দধারার আব্দুস সালাম, প্রতিভা অন্বেষণের আব্দুল হালিম, ইচ্ছে ফোরামের মাহমুদুল হাসান, রাজশাহী সাইক্লিস্টের অপূর্ব জোয়ারদার, স্পর্শের শাখাওয়াত হোসেন, হেল্প পিপলের আল রশীদ, বরেন্দ্র শিক্ষা সংস্কৃতি বৈচিত্র্য রক্ষা কেন্দ্রের জাওয়াদ আহমেদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইচ্ছে’র মাহাদী হোসাইন প্রমুখ।

স্বেচ্ছাসেবা দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তানোরের বিলুপ্ত ধান সংগ্রাহক ইউসুফ আলী, মনিগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হোসনে আরা পারভীন, পাঁচ টাকায় স্কুল শিক্ষার্থীদের টিফিন দেওয়া রাজশাহীর আড়ানীর বিপ্লব সরকার, ধানের বীজ সংগ্রাহক নূর মোহাম্মদ, কৃষকের আবহাওয়া নিয়ে কাজ করা কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অজ্ঞাত রোগীদের পাশে দাঁড়ানো আলেয়া বেগম, আলোর পথে বিদ্যানিকেতনের আবু জাফর।

বিরল প্রজাতির গাছ সংগ্রাহক মাহবুব ইসলাম, স্বেচ্ছায় প্রতি শুক্রবারে খাবার দেওয়া ফারুক হোসেন প্রমুখ। তাঁরা জানান, এই অনুষ্ঠানে এসে তাঁরা আরও বেশি উৎসাহিত হয়েছেন। তাঁদের অনেক অগ্রজ স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের স্বেচ্ছাসেবার গল্প শুনে তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়ে আরও কাজ করে যাবেন। ৩৫ বছর বয়সী যেকোনো ব্যক্তি বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ২০১৯ সালে তাদের কার্যক্রমের জন্য এই সম্মাননা পাবেন।

About pullman pullman

Check Also

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে বসেছে ৩টি নতুন থার্মাল স্ক্যানার

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন তিনটি থার্মাল স্ক্যানার বসেছে। আজ মঙ্গলবার স্ক্যানারগুলো ঢাকার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *